আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় শিল্পপতি আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানির বিরুদ্ধে। ভারতের সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের ২ হাজার ২৯ কোটি রুপি ঘুষের প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
গৌতম আদানি ও তার ভাতিজা সাগর আদানি, দুজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। গত বুধবার (২০ নভেম্বর) মার্কিন আদালত গৌতম আদানিকে অভিযুক্ত করে। খবর দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস ও আল জাজিরার।
মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) অভিযোগ করেছে যে, সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি লাভজনক চুক্তি পেতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছেন গৌতম আদানি, যার কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এদিকে, আদানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির একদিন পর আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো গৌতম আদানির সঙ্গে হওয়া দুটি বড় চুক্তি বাতিল করেছেন। আদানি গ্রুপ কেনিয়ায় ১.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল, যার আওতায় তারা প্রধান বিমানবন্দরটি ৩০ বছর ধরে পরিচালনা করার কথা ছিল। এছাড়া, বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৭৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।
অপরদিকে, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে, তবে সম্প্রতি তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি ও বকেয়া অর্থ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আদালত আদানি গ্রুপের সঙ্গে হওয়া চুক্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
এ বিষয়ে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে বলেছেন, গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি বাংলাদেশে লাভজনক হতে পারে। তিনি জানান, ঢাকার আদালত আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, এবং এর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রে আদানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
ড. ইজাজ আরও বলেন, আদানি ও শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যে হওয়া জ্বালানি চুক্তি প্রথম থেকেই বিতর্কিত ছিল, কারণ এই চুক্তি কোন টেন্ডার ছাড়াই করা হয়েছিল। তাছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকার আদানির সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের পর, আলোচনা অনেকটা সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আদানি গ্রুপের ওপর বিদ্যুতের দাম পুনঃনির্ধারণে চাপ বৃদ্ধি পাবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্য হিন্দুর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করার পর কোনো মন্তব্য করেনি, তবে তাদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, জি২জি চুক্তির আওতায় আদানি গ্রুপ এখনও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে এবং তারা প্রয়োজন না হলে এই চুক্তি নিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা থেকে বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে, যা বিশেষভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
ড. ইজাজ হোসেন আরও বলেন, আদানি বাংলাদেশকে যে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে তারা অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা এনে সেগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে বাংলাদেশে পাঠাবে, যা বাংলাদেশের জন্য যৌক্তিক ছিল, কারণ দেশের গভীর সমুদ্র বন্দর নেই। তবে পরে সমালোচকরা বলেছিলেন যে, আদানি ভারতের সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পেয়েছে, কিন্তু এই ভর্তুকি বাংলাদেশে ভাগ করা হয়নি।
বিদ্যুৎ দাম নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল, এবং শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে আদানির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আদানির কাছে বিদ্যুৎ দাম পুনঃমূল্যায়ন করার জন্য চিঠি পাঠায়। তবে, আদানি জানায়, তারা প্রতি মেট্রিক টন কয়লা ৪০০ ডলারে কিনছে, কিন্তু বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানায়, অন্যান্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে তারা একই পণ্যের জন্য ২৫০ ডলারের কম দাম দিচ্ছে।
এদিকে, আদালত আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার ফলে, বাংলাদেশ এখন পুরো চুক্তিটি পুনঃপর্যালোচনা করতে পারবে।



0 Comments