আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য যে কারও মতো তারাও স্বাধীন। আমরা তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব।’
টাইমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন এবং মানবাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়েও আলোচিত হয়েছে প্রতিবেদনে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হবে নাকি সংসদীয় ব্যবস্থা বহাল থাকবে, কিংবা সংসদ এককক্ষ বিশিষ্ট হবে নাকি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। পাশাপাশি, সংবিধান সংস্কারের বৈধতার জন্য গণভোট প্রয়োজন কিনা, সে প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বর্তমান কোনো রাজনীতিককে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
এ বিষয়ে বিএনপির তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, "কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তারা ছয়টি সংস্কার কমিটি গঠন করেছে। এটি ভালো লক্ষণ নয় এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারের ইঙ্গিত দেয়।"
ওয়াহিদুজ্জামান যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের সময়সীমা ও রূপরেখা নির্ধারণের দাবি জানালেও, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ বিষয়ে তাড়াহুড়া করতে নারাজ। তিনি বলেন, "নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। আমাদের আগে রেললাইন ঠিক করতে হবে, যাতে ট্রেন সঠিক দিকে যেতে পারে।"
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ছাড়া সত্যিকারের জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব নাও হতে পারে। একসময় দলটির বিপুল জনসমর্থন ছিল। বর্তমানে দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের সদস্যরা দাবি করছেন, তাঁরা নির্বিচারে হামলার শিকার হচ্ছেন।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, যিনি গত জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন, টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করছেন না, কারণ তাঁর হৃদ্রোগ রয়েছে এবং তিনি আশঙ্কা করছেন যে জামিন পাবেন না। তিনি আরও বলেন, "আমার পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে, পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। আমি অসুস্থ এবং চার মাস ধরে পরিবারের সদস্যদের দেখতে পাইনি।"
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে যারা একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিয়ে গর্ব করতেন, তারা এখন দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন। কারণ, তাঁরা আশঙ্কা করছেন, এ সম্পর্ককে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
এছাড়া, মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, শেখ হাসিনার প্রতি সহানুভূতিশীল সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত ২৫ জনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সহিংসতার মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আগামী জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলিকে আরও বড় করে তুলে ধরতে চাইছে আওয়ামী লীগ। এর মাধ্যমে দলটি প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে, কট্টর ইসলামপন্থীরা দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।
৩১ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (পূর্বের টুইটার) ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নিন্দা জানান। তিনি লেখেন, "বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। দলবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।"
এ অবস্থায়, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রভাবশালী মার্কিনরা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তদবির করছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট নেতা হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, "ট্রাম্পের জয় আমাদের এতটাই আঘাত দিয়েছে যে আজ সকালে কথা বলার শক্তিও পাচ্ছিলাম।"
তবে ড. ইউনূস আত্মবিশ্বাসী যে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি অভিন্ন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে পারবেন। তিনি বলেন, "ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, আমরাও ব্যবসার মধ্যে রয়েছি। কোনো সংকট থেকে বের হতে অর্থ চাইছি না, বরং আমরা একটি ব্যবসায়ী অংশীদার চাই।"



0 Comments