Advertisement

বিভেদ নয়, ঐক্যের পথে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

নতুন বছরে সরকারের অগ্রাধিকার থাকবে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার।


স্বাগত ২০২৫। পুরনো অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুনের সূর্যোদয়ই নববর্ষের মূল বার্তা। নতুন এই বছর এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। স্বৈরাচারের পতনের পর, প্রতিটি হৃদয়ে এখন জেগে উঠেছে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সবার আকাঙ্ক্ষা—পুরনো বিভেদ ও বিভাজনের পথ নয়, বরং বাংলাদেশ হয়ে উঠুক ঐক্যের প্রতীক, যার ভিত্তি তৈরি করেছে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি।

মত ও আদর্শের ভিন্নতা যেন ধ্বংসাত্মক না হয়ে গণতন্ত্রের বৈচিত্র্যে পরিণত হয়। সামনে ঝুঁকি ও চক্রান্ত থাকবেই, কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে তা প্রতিরোধের অটল শক্তিতে ম্লান হয়ে যাক। ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’—এই বারুদমাখা স্লোগান আগামী দিনের জন্য থাকুক সতর্কবার্তা হিসেবে। নতুন বছর হোক ঐক্য, গণতন্ত্র, এবং অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি।

এক নজরে ফিরে দেখা ২০২৪

২০২৪ সাল নানা ঘটনা ও বিতর্কে ভরা একটি বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বছরের শুরুতেই, ৭ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় বিতর্কিত ‘ডামি’ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর ফেব্রুয়ারিতে বেইলি রোডের একটি রেস্তোরাঁয় ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। মার্চে এমভি আব্দুল্লাহ ছিনতাইয়ের ঘটনা আলোড়ন তোলে।

এপ্রিল মাসে ফোর্বসের ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া’ তালিকায় জায়গা করে নেয় ৯ বাংলাদেশি তরুণ, যা ছিল একটি গর্বের মুহূর্ত। একই সময় এমপি আনোয়ারুল আজিম হত্যাকাণ্ড ও ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়। সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, মতিউর রহমানের ‘ছাগলকাণ্ড,’ এবং পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়।

মে মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়, আর আলোচনায় আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের গুঞ্জন। জুনে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। একই সময় ঢাবির তোফাজ্জল হোসেন গণপিটুনিতে নিহত হন।

জুলাইয়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু এবং বান্দরবানে কেএনএফের পাঁচ সদস্যের গ্রেপ্তার উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আগস্টে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০০-র বেশি মামলা নতুন আলোচনা তৈরি করে।

সেপ্টেম্বরে আনসারদের হঠাৎ আন্দোলন এবং প্যাডেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের প্রতিবাদ ঢাকার রাস্তায় অচলাবস্থা তৈরি করে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ও ইসকন প্রসঙ্গ নিয়েও উত্তেজনা ছড়ায়। তবে এশিয়া কাপ শিরোপা জয় দেশের জন্য আনন্দের মুহূর্ত নিয়ে আসে।

বছরের শেষ দিকে, ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা এবং সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ড দেশজুড়ে তোলপাড় করে।

৩১ ডিসেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি পালিত হয়। যদিও শুরুতে এটি ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল, শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হয় ঘোষণাপত্রের বদলে সমাবেশ আয়োজনের। প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হবে।

২০২৪ সাল ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক আন্দোলন এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য-সংকটের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়।

মূল ঘটনা ছিল হাসিনার বিদায়
শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন শুরু হয় ২০১২ সালে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ না নিয়ে বয়কট করে। এরপর ২০১৮ সালের "মধ্যরাতের নির্বাচন" এবং ২০২৩ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে হাসিনা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসেন। বিরোধীরা রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে থাকলেও কঠোর দমননীতির মুখে সফল হয়নি। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিস্থিতি বদলে দেয়। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপ্রতিরোধের মুখে হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ভারতে আশ্রয় নেয়া হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

স্লোগানগুলো প্রেরণা হয়ে থাকবে
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া স্লোগানগুলো ভবিষ্যতের আন্দোলনে শক্তি জোগাবে। আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল, "এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়" এবং "বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।" আবু সাঈদের মৃত্যুর পর এই স্লোগানগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

নতুন বছরে পাঁচটি অগ্রাধিকার
১. গণহত্যার বিচার: হাসিনা সরকার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে।
২. ত্রয়োদশ নির্বাচন: ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
৩. রাষ্ট্র সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
৪. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ: বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর প্রভাব দেখা যায়নি।
৫. আইনশৃঙ্খলা: সহিংসতা ও অস্থিরতা মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য ও কার্যকর ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন
নতুন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ঐক্যের বিকল্প নেই। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে একত্রিতভাবে এগোতে হবে।

নতুন বছর হয়ে উঠুক স্থিতিশীল ও স্বস্তিময়।

Post a Comment

0 Comments