Advertisement

নির্বাচনী অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচনী অপরাধ করে যারা নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে, কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে বা কারচুপিকে সমর্থন দিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, “অন্যায়কারীদের নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, যা আমি যৌক্তিক মনে করি। কারণ, অন্যায় করে পার পেয়ে গেলে তা আরও উৎসাহিত হয়।”

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, এটি সংস্কার করতে হবে। তবেই নির্বাচন কার্যকর হবে। মতবিনিময় সভায় এ ধরনের অনেক প্রস্তাব উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে, ভোটার তালিকায় প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে। আমরা যে প্রস্তাবগুলো দিচ্ছি, সবগুলো না হলেও যতগুলো সম্ভব, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।”

সংস্কার কমিশন কতদিন কাজ করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমাদের কাজ তিন মাসের জন্য নির্ধারিত। অক্টোবরের ৩ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব ডিসেম্বরের মধ্যেই আমাদের প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করতে। আমাদের দেওয়া প্রস্তাবনার কিছু বাস্তবায়ন করবে সরকার, কিছু করবে নির্বাচন কমিশন, আর কিছু বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে আপনাদের (গণমাধ্যম) এবং সাধারণ মানুষের ওপর।”

ইভিএম প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে ইভিএম ব্যবহার হবে না। নির্বাচন কমিশনও তা জানিয়েছে। কারণ, এটি একটি দুর্বল যন্ত্র এবং এর মাধ্যমে কারচুপির সম্ভাবনা থাকে। নির্বাচনে কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন, যা ইভিএমের ক্ষেত্রে ছিল না। শুধু তাই নয়, ইভিএম কেনার সময় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীও এর বিরোধিতা করেছিলেন। সেই মতামত উপেক্ষা করে এটি কেনা হয়েছিল। এবার আর ইভিএম ব্যবহার হবে না, এটা নিশ্চিত।”

সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, “অনেক প্রস্তাব এসেছে, সব বলতে সারা দিন লাগবে। তবে মূল প্রস্তাবগুলো হলো—নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর করা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, নির্বাচনী অপরাধের বিচার, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, আচরণবিধি সংশোধন এবং গণমাধ্যমের আচরণবিধি নির্ধারণ। এসব বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, মতামত নিচ্ছি এবং সুপারিশ প্রণয়ন করছি।”

নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই কমিশনের কাজ নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো, ভেঙে পড়া নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রস্তাব করা। নির্বাচন কবে হবে, তা আমাদের এখতিয়ারের বাইরে।”

এর আগে সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন বদিউল আলম মজুমদার। সভায় সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি, শাসন প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন, বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার আজিম আহমেদ, জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। 

মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

  • তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন।
  • একই ব্যক্তি যেন দুইবারের বেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।
  • অহেতুক নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে শব্দ দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • সারা দেশে চারটি বা বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচনী অঞ্চল ঘোষণা করে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন।
  • নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ ও প্রশাসনকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা।
  • নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
  • প্রবাসীদের জন্য অনলাইনে ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি।
  • নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ।
  • “না ভোট” প্রদানের বিধান পুনরায় চালু করা।
  • বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত না করে প্রয়োজনে পুনরায় ভোট গ্রহণ।
  • পোলিং এজেন্টদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিয়ে আসা।
  • ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ বাতিল।

এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।


Post a Comment

0 Comments