জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচনের ইঙ্গিত দিলেও এখনো স্পষ্টভাবে কিছু জানায়নি। নির্বাচনের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।
শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "বিগত সাড়ে ১৭ বছর জাতি ফ্যাসিবাদের অধীনে ছিল। ফ্যাসিবাদের পতন হলে মজলুম মানুষ তাদের আর গ্রহণ করে না। তখন তাদের দেশে থাকার সৎ সাহস থাকে না। মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনরা যেমন পালিয়ে গেছে, পরবর্তীরাও তাই করেছে। যারা অসংখ্য অপকর্ম করে, তাদের নৈতিক সাহস থাকে না মানুষের সামনে দাঁড়ানোর। তাদের পতন হয় অপমানজনকভাবে।"
তিনি আরও বলেন, "জনগণ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করতে সংগ্রাম করেছে। তবে সমাজ এখনো বৈষম্যে পূর্ণ। বিগত ১৭ বছরের জঞ্জাল এখনো দূর হয়নি। স্বৈরাচার পালিয়ে গেলেও আমরা কেন মুক্ত হতে পারলাম না? এর জবাব ১৮ কোটি মানুষের সামনে রয়েছে। আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়েছে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে। কিন্তু এগুলো এখনো চলছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজির চেয়ে ভিক্ষা করা উত্তম।"
চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "সরকার যদি সহযোগিতা চায়, তবে জামায়াত সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।"
তিনি বলেন, "জামায়াতে ইসলামীর ওপর সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালানো হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের হত্যা, অফিস বন্ধ, অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও পঙ্গু করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি নিবন্ধন ও প্রতীক কেড়ে নিয়ে দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আমরা ধৈর্য ধরেছি এবং আল্লাহর ইচ্ছায় ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে আমাদের জন্য নেয়ামত এসেছে।"
জামায়াতের আমির আরও বলেন, "আল্লাহ আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দিলে আমরা সেবক হব, মালিক নয়। অতীতে আমরা প্রমাণ দিয়েছি। আমাদের দু'জন মন্ত্রী এমন ছিলেন যাদের দুর্নীতি বা অপরাধ প্রমাণ করতে কেউ সক্ষম হয়নি। তাদের ২০টি আঙুলই ছিল পরিচ্ছন্ন।"
তিনি বলেন, "আমরা কোনো প্রতিবেশীর অধিকার ক্ষুণ্ন করতে চাই না, কোনো প্রতিবেশীর প্রতি অন্যায় বা জুলুমের হাত বাড়াতে চাই না। সন্ত্রাসের মাধ্যমে হাত বাড়াতেও চাই না। একইসঙ্গে, আমরা এটাও পছন্দ করি না যে কেউ আমাদের দিকেও অন্যায়ভাবে হাত বাড়াক। আমরা কখনো এটা মেনে নিইনি, ভবিষ্যতেও নেব না। জামায়াতই একমাত্র দল যারা কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। যারা আল্লাহকে সেজদা দেয়, তারা অন্য কারো কাছে মাথা নত করে না।"
অন্তর্বর্তী সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, "বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসেননি; তারা বিপ্লবের ফসল। মজলুম জনগণ তাদের এখানে বসিয়েছেন। আপনারা আল্লাহকে ভয় করে স্বচ্ছ থাকুন। জনগণকে হতাশ করবেন না। ন্যায়সংগত ও ন্যায্য কাজগুলো কোনো সংকোচ ছাড়াই করে যান। জনগণ আপনাদের পাশে রয়েছে। দেশি-বিদেশি কোনো চাপ বা চোখ রাঙানিকে পাত্তা দেবেন না। তবে, জনগণের আমানত নষ্ট করলে জনগণও আপনাদের ছাড় দেবে না। এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের বিতাড়িত করতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।"
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "সাড়ে ১৭ বছর আমরা ধৈর্য ধরেছি এবং জাতির স্বার্থে আরো কিছুদিন ধৈর্য ধরতে প্রস্তুত আছি। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আমাদের মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। ক্ষমতা একটি আমানত। বিগত সাড়ে ১৭ বছরে যে জঞ্জাল তৈরি হয়েছে, তা দূর না করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা কোনো প্রভাবিত বা পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন চাই না। আমরা চাই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।"
তিনি আরো বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরাও জুলুমের শিকার হয়েছেন। আমরা আশা করি, মজলুম হিসেবে তারা দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সম্মান করবেন। যৌক্তিক সময়ের চেয়ে এক মিনিটও বেশি সময় নেবেন না। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আগামী বছরের শেষের দিকে বা পরবর্তী বছরের মাঝামাঝি নির্বাচন হতে পারে। তবে এখনো নির্বাচনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। আমরা সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানাই। পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হোক, যাতে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।"
তিনি আরো বলেন, "এ সরকার যেন মইন সরকারের মতো কোনো নতুন দল গঠন করে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা না করে। সরকারের কেউ যদি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হতে চান, তবে তাদের উচিত হবে সরকার থেকে সরে গিয়ে দল গঠন করা। এটি স্বচ্ছতার একটি উদাহরণ হবে। আমরা চাই, এ সরকার হোক জনমানুষের সরকার। এরপর জনগণের ভোটে নির্বাচিত দলীয় সরকার দায়িত্ব পালন করবে, যা জনগণের সেবা করবে।"
বাজার সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এখনো বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়নি। এটি অবশ্যই ভাঙতে হবে। যদি সিন্ডিকেটের হাত বদল হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ করে দিতে হবে। কারণ তারা জনগণের দুশমন। এ দেশের মানুষ আর কারো ভাড়াটিয়া হয়ে বাঁচবে না। সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে।"
ইসলামী দলগুলো নিয়ে তিনি বলেন, "সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে ইসলামী দলগুলো। হেফাজতের নেতাকর্মীদের প্রতি যে নির্মমতা করা হয়েছে, তা জনগণ দেখেছে। ৫ আগস্টের পর চার দিন কোনো সরকার ছিল না। সেই সময়ে ইসলামী দলের নেতাকর্মীরা জনগণকে পাহারা দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারা জনগণের সেবায় নিবেদিত। ইসলামী দলের নেতাকর্মীরা কখনো চাঁদাবাজি করে না।"
তিনি বলেন, "জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সবাই সমান অধিকার পাবে। নারীরা সম্মান পাবে, এবং কারো ওপর কোনো পোশাক চাপিয়ে দেওয়া হবে না। একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠিত হবে।" নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "সকল কাজ সঠিক নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে এবং কঠোর পরিশ্রমে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।"
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, "অন্যায়-অবিচার বন্ধ করতে হলে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং তা কেবল ইসলামই করতে পারে। অন্যান্য তন্ত্র-মন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। এই দেশের মানুষের দিন শুরু হয় আজানের শব্দে। তারা কোরআনের শাসন চায়। কোরআনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ মুক্তি পাবে, নারীরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে।"
তিনি আরো বলেন, "স্বৈরাচার এখনো হাল ছাড়েনি। জনগণকে অতন্ত্র প্রহরীর মতো দেশ পাহারা দিতে হবে, যাতে তারা আর ফিরে আসতে না পারে।"
ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে এবং ঢাকা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আফজাল হোসাইনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুল মান্নান, অ্যাডভোকেট মশিউল আলম, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির আব্দুল জাব্বার, নরসিংদী জেলা আমির মাওলানা মোছলেহ উদ্দিন, মুন্সিগঞ্জ জেলা আমির আজম রুহুল কুদ্দুস, এবং ঢাকা জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ শাহিনুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি



0 Comments