বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে কেবল বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
তবে অন্যান্য অর্থনীতিবিদদের মতে, এটির পরিমাণ আরও বেশি। তাদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ৩০ বিলিয়ন বা ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। যদিও পাচার হওয়া অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।
বিভিন্ন ধরনের আর্থিক হিসাব-নিকাশ করে আহসান মনসুর বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে তার সহযোগীরা বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ অর্থ লুট করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
বুধবার নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ক শ্বেতপত্র কমিটি জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
এ বিষয়ে আহসান মনসুর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল যে লুটপাটের জন্য ব্যাংক হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শত শত কোটি ডলার বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছে, যেগুলোর অনেকের অস্তিত্ব নেই। এই অর্থও সম্ভবত আর ব্যাংকে ফিরে আসবে না, বরং একটি বড় অংশ দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে।
আহসান মনসুর, যিনি ২৭ বছর ধরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করছেন, বলেছেন, ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ হাইজ্যাক করা হয়েছিল। তার মতে, বিশ্বের অন্য কোথাও সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এভাবে গুন্ডা-মাস্তানদের সহযোগিতায় পুরো ব্যাংক খাতে এমন পদ্ধতিগতভাবে ডাকাতি করেছে, এমন ঘটনা তার দেখা হয়নি।
বাংলাদেশের আগামী অর্থনীতি নিয়ে আহসান মনসুর বলেন, আগামী বছর অর্থনীতির আকাশে আরও ঝড় উঠবে; তারপর পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, তাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এদিকে শেখ হাসিনার একজন সহযোগী সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত চলছে, তবে তার বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগ গঠন হয়নি।
এ বিষয়ে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ‘উইচ হান্ট’ করা হচ্ছে, এবং তিনিও এর বাইরে নন।
নিউইয়র্ক টাইমস শেখ হাসিনা ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় শূন্য পড়ে আছে, এবং তারা শেখ হাসিনার মুখপাত্রের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেনি।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নানের পদত্যাগের ঘটনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি আব্দুল মান্নান কার্যালয়ে যাওয়ার পথে সামরিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের ফোন কল পান, যেখানে তাকে তাদের সদর দপ্তরে যেতে বলা হয়।
অক্টোবরে আব্দুল মান্নান নিউইয়র্ক টাইমসকে ওই ঘটনার বিবরণ দেন। কার্যালয়ে গিয়ে সামরিক গোয়েন্দারা তার ফোন, ঘড়ি ও ওয়ালেট রেখে দেন। এরপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান তাকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের কারণে প্রশংসা করেন।
আব্দুল মান্নান ভাবছিলেন, তার সময়টা বোধহয় বৃথা যাচ্ছে, কিন্তু পরে তাকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। গোয়েন্দা প্রধান তাকে বলেন, এই আদেশ দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে এসেছে, অর্থাৎ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রথমে তিনি পদত্যাগে রাজি হননি, কিন্তু পরিস্থিতি তার পক্ষে না গেলে তিনি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, ‘আমি যে ধরনের মানুষ, তাতে ওই সময়ে আমাকে যে অপমানজনক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তার বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়।’ পরে তিনি পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করেন এবং পরবর্তী আট বছর তিনি কার্যত নির্বাসনে ছিলেন; এখন আবার একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন।
আব্দুল মান্নান ও আহসান মনসুর একই সুরে বলেন, ওই ঘটনার পর এস আলম গোষ্ঠী ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ট্রেডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন এবং শেখ হাসিনার আমলে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, এস আলম গ্রুপ অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্যাংক খাতকে শূন্য করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল।
হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএফআইইউর নির্বাহী পরিচালক এ কে এম এহসান। ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক এস আলম গোষ্ঠীর হাতে যাওয়ার পর বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ আর ফেরত আসেনি এবং ফলে সেগুলো খেলাপি হয়ে গেছে।
এস আলম গ্রুপও বসে নেই। তারা আইনি প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েলের মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যেখানে তারা জানিয়েছে, দেশে একটি মাত্র ব্যাংক তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেটা ইসলামী ব্যাংক নয়। তাদের অভিযোগ, আহসান এইচ মনসুর তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক আচরণ করছেন এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না।
লাইফ সাপোর্টে ব্যাংক খাত
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। এমনকি যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো, তারাও যথেষ্ট ঋণ দিতে পারছে না এবং আমানতকারীদের টাকা সব সময় ফেরত দিতে পারছে না। তারা মাঝে মাঝে আমানতকারীদের টাকা তোলার সুযোগ দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনার দলের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হয়েছে, যা মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘটেছে।
এই পাচার শুধু কিছু মানুষের পকেট ভারি করেনি, বরং এতে বাংলাদেশের মুদ্রার দরপতনও ঘটেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গতি বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের মুদ্রার বড় ধরনের দরপতন ঘটে, যার ফলে আমদানির মূল্য বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পুরো বেতন তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনকি যেদিন বেতন দেওয়ার কথা, সেদিনও তারা পুরো টাকা তুলতে পারছেন না।
ওষুধ কোম্পানি টেকনো ড্রাগ কর্মীদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। কোম্পানির সহমহাব্যবস্থাপক মাজেদুল করিম নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে ব্যাংক টাকা দিতে পারছে না, ফলে কোম্পানি বাধ্য হয়ে নগদ অর্থে মজুরি পরিশোধ করছে।
তিনি আরও জানান, নিজের ডেবিট কার্ড দিয়েও টাকা তোলা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ আহসান মনসুর বলেন, এ বছর বাংলাদেশের জন্য প্রবৃদ্ধির বছর নয়, যদিও মূল্যস্ফীতির হার কমে আসছে এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের মুদ্রা স্থিতিশীল করতে আরও তিন বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার সহায়তা দেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।



0 Comments