দেশের ভ্রমণপিপাসুরা এবার ভারত পরিহার করে কক্সবাজারে ভ্রমণ করছেন। হোটেল ও মোটেলগুলো অগ্রিম বুকিংয়ে পূর্ণ, এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে তৎপর।
বারবার হোঁচট খাওয়ার পর দেশের পর্যটন শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে পূর্ণ উদ্যোমে পর্যটন মৌসুম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজারসহ দেশের নানা পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় সবখানে লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে, সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে বৈরী মনোভাব প্রকাশ করার পর, বাংলাদেশের মানুষ ভারত যাত্রা পরিহার করে এখন দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দিকে ঝুঁকেছেন। পর্যটন মৌসুমে ভারত না গিয়ে, কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য জনপ্রিয় স্পটে ভিড় করছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে দুই লাখেরও বেশি পর্যটক ভারতে ভ্রমণে যায়। কিন্তু এবার ভারতের বিদ্বেষমূলক আচরণের কারণে ওইসব ভ্রমণপিপাসু ভারত না গিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ছুটে আসছেন।
করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে বিশ্বের পর্যটন ও ভ্রমণ খাত মুখ থুবড়ে পড়েছিল, তবে এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। ২০২১ সাল থেকে পর্যটন খাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে এটি প্রাক-মহামারি পর্যায়ে ফিরছে। ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন ও ভ্রমণ খাতের অবদান ছিল ৯.৯ ট্রিলিয়ন বা ৯ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার, যা প্রাক-মহামারি পর্যায়ের কাছাকাছি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটন ও ভ্রমণের চাহিদা বাড়ছে এবং বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মহামারির সময়ের নিষেধাজ্ঞা এখন উঠে গেছে।
তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যটন খাত কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছিল। তবে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর, দেশের মানুষের মধ্যে আবার স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখন সবাই এক অনাবিল শান্তি ও স্বস্তির মধ্যে সময় পার করছে, যার ফলে মানুষের মধ্যে ভ্রমণের আকাক্সক্ষা বেড়েছে। এ কারণে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলো ইতোমধ্যে প্রায় বুকড হয়ে গেছে। ছাত্রদের পরীক্ষা শেষ হতে যাচ্ছে, সামনে বিজয় দিবস, বড়দিন ও থার্টিফাস্ট নাইট—সব মিলিয়ে ভ্রমণপিপাসুরা এখনই বেড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পর্যটন শিল্পের এই জমজমাট পরিস্থিতি বজায় রাখতে হলে কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তার বিষয়টিতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে, বিশেষ করে নারীদের একা ভ্রমণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, পর্যটকদের উপস্থিতিকে পুঁজি করে যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা না নেয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। হোটেল ও খাবারের দাম যেন স্বাভাবিক সময়ের মতো থাকে, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। গত বছর পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে হোটেল ব্যবসায়ীরা দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল, যা পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছিল। এ বিষয়ে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘‘এবার আমরা সজাগ থাকব, যাতে অতিমুনাফার লোভে কোনো হোটেল মালিক পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম না নেয়।’’
এদিকে, নিরাপত্তার বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপর রয়েছে। সব মিলিয়ে, পর্যটকদের ভ্রমণ যেন আনন্দদায়ক হয়, সে জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে শামসুল হক শারেক জানান, কক্সবাজারে লাখ লাখ পর্যটক আসতে শুরু করেছে। সমুদ্র সৈকত, কক্সবাজার শহর এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। বিশেষত, সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের সাথে বৈরী মনোভাব প্রকাশ করার পর, বাংলাদেশের মানুষ ভারত না গিয়ে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দিকে ঝুঁকেছে।
কক্সবাজার ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা সদা তৎপর। হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, রেস্ট হাউস, জাহাজ ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের আন্তরিকতার সাথে স্বাগত জানাচ্ছেন। পান দোকান থেকে শুরু করে শুঁটকির দোকান, আচার দোকান, বড় বড় হোটেল, রেস্ট হাউস ও রেস্টুরেন্টগুলো পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। শহরের দোকানদার, ইজিবাইক ও রিকশাচালকরা আগের চেয়ে আরও আন্তরিকভাবে পর্যটকদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
খবর অনুযায়ী, নভেম্বরের শেষ দিকে ডিসেম্বরের জন্য প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় হোটেল ও রেস্ট হাউস অনলাইন ও অফলাইনে বুক হয়ে গেছে। এখন যারা কক্সবাজার আসছেন, তারা ঠিকমতো বুকিং পাচ্ছেন না। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কক্সবাজার বিমানবন্দরে ২০টির বেশি ফ্লাইটে শত শত পর্যটক আসা-যাওয়া করছেন। এছাড়াও, তিনটি ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজারে আসছেন, আর শতাধিক পরিবহন সংস্থার গাড়িতে লাখো পর্যটক যাতায়াত করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, সম্প্রতি তা তুলে নেয়া হয়েছে এবং ডিসেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এখন পর্যটকরা কক্সবাজার ভ্রমণ করে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারছেন। এই পরিবর্তনটি কক্সবাজার তথা দেশের পর্যটন খাতের জন্য সুখবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কয়েকজন পর্যটকের সাথে সৈকতে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রতি বছর এই সময় ভারতের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বেড়াতে যান। তবে সম্প্রতি ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের পদক্ষেপ ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের কারণে, বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ায়, তারা ভারত ভ্রমণ স্থগিত করে কক্সবাজারে আসতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
টোয়াক নেতা ও পর্যটন ব্যবসায়ী আনোয়ার কামাল বলেন, ‘‘পর্যটকদের আগমন বাড়ছে। তবে সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞা না থাকলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়ত।’’
কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনের মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ হোটেল-মোটেল অনলাইনে অগ্রিম বুকড হয়ে গেছে এবং বর্তমানে নতুন বুকিং নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘‘কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত, হোটেল-মোটেলে বুকিং সন্তোষজনক।’’ হোটেল কক্সটুডের সিইউ আবুতালেব শাহ এবং সিগালের সিইউ ইমরুল হাসান রুমী জানান, এবারের পর্যটন মৌসুমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন দেশের পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক খবর।
এদিকে, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন, ‘‘কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো এবং স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।’’ তিনি আরও জানান, ‘‘কক্সবাজার জেলা পুলিশ পর্যটনের বিকাশে প্রযুক্তি ভিত্তিক সেবা চালু করেছে, যার মধ্যে অনলাইন বাসটার্মিনাল, কক্স ক্যাবসহ অনলাইন হোটেল বোর্ডিং ইনফরমেশন সেন্টার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’’
সিলেট থেকেও পর্যটক আগমন বেড়েছে, বিশেষ করে শীতকালে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহী পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘‘প্রকৃতি কন্যা সিলেটে এবার পর্যটকদের ঢল নামবে বলে আশা করছি।’’
রাঙামাটির সরু আঁকাবাঁকা সড়ক ও কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। এই সড়কটি রাঙামাটি শহরের দৃষ্টিনন্দন আসামবস্তি-কাপ্তাই সংযোগ সড়ক, যা প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম থেকে আসা কবির হোসেন বলেন, ‘‘এখানকার পরিবেশ এত সুন্দর যে, যদি আগে জানতাম তাহলে এখানেই প্রথমে আসতাম।’’
পটুয়াখালী থেকে মো. জাকির হোসেন জানান, ‘‘দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কুয়াকাটায় পর্যটকরা আবার আসতে শুরু করেছেন। দীর্ঘদিন পর সড়কটি মেরামত হওয়ায়, এখন পর্যটকরা নির্বিঘ্নে কুয়াকাটা আসতে পারছেন।’’ ইতোমধ্যে কুয়াকাটার হোটেলগুলোর অধিকাংশ রুম বুকড হয়ে গেছে এবং বিজয় দিবসের ছুটিতে কুয়াকাটার পর্যটন স্পট জমজমাট হয়ে উঠেছে।
এভাবে, দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকদের আগমন বেড়েছে এবং ২০২৪ সালের পর্যটন মৌসুমটি দেশের পর্যটন খাতের জন্য আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে।



0 Comments