Advertisement

অর্থপাচার: আওয়ামী লীগের কৌশল

 

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থপাচার সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রতিবেদন রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। ওই প্রতিবেদনে বিগত সরকারের আমলে অর্থপাচারের আনুমানিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সোমবার সকালে তার ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন, যা এখানে তুলে ধরা হলো:

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলারের মূল্য ১২০ টাকা) এই পরিমাণ অর্থ ২৮ লাখ কোটি টাকায় পরিণত হয়। এর মানে প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের পেছনে দায়ী ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের বড় বড় খেলোয়াড় (ক্রীড়নক), আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

রোববার, অর্থনীতি সংক্রান্ত শ্বেতপত্র প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। ওই প্রতিবেদনে বিগত সরকারের আমলে অর্থপাচারের আনুমানিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি রিপোর্টস (জিএফআইআরএস) এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট পূর্বানুমানের ভিত্তিতে এই পাচারের হিসাব করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে অর্থ পাচার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে এবং এই পাচারকে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ‘টিউমার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের একটি বড় অংশ এই ক্ষতিকর টিউমার চুষে নিয়েছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি বিশ্বাস করে যে, প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৪ শতাংশ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। এছাড়া, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় থেকে যে অর্থ এসেছে, তার এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ অর্থ এক বছরে পাচার হয়ে গেছে। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে যত অর্থ এসেছে, তার দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়।

প্রতিবেদনটি টাকা পাচারকে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ‘টিউমার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের বড় একটি অংশ এই ক্ষতিকর টিউমার দ্বারা শোষিত হয়েছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সভাপতি এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদনটি তুলে দেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার, প্রকল্প লুটপাট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিসংখ্যানের ব্যবহারসহ নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমেছে, এবং এতে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ৩৯৭ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রে মোট ২২টি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, সরকারি ব্যয় (সরকারি বিনিয়োগ, এডিপি, ভর্তুকি ও ঋণ), বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি কেনাকাটা ও খাদ্য বিতরণ, রপ্তানি, আমদানি, প্রবাসী আয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিদেশি অর্থায়ন।

বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের চিত্র: শ্বেতপত্রের বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের অন্যতম গন্তব্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ করের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছোট ছোট দেশগুলো। এসব দেশে মূলত বাড়ি কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়।

কীভাবে টাকা পাচার হয়?

শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের রাঘববোয়াল, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরা ঘুষ, দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ, মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে বাণিজ্য, ব্যাংক থেকে চুরি করা টাকা, খেলাপি ঋণের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে।

শ্বেতপত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পত্তি রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কর্মসূচির আওতায় ৩,৬০০ বাংলাদেশি মনোনীত হয়েছেন। ইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে।

পাচারের কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি

শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থ পাচারের জন্য প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, আইনি দায়মুক্তি এবং সুশাসনের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে পরবর্তী সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও বলা হয়েছে, পূর্বে ঘুষ বা দুর্নীতির অর্থ দেশেই বিনিয়োগ করা হত, যার মাধ্যমে ছায়া অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এসব অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যাতে নিরাপদে রাখা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের সম্পদ কেনা যায়।

আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘুষ

সরকারি বিনিয়োগের জন্য প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ঘুষ হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই ঘুষ পেয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা এবং তাদের সহযোগীরা।

শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে ১৩টি মেট্রোরেল বা ২২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল।

শেয়ারবাজারে ১ লাখ কোটি টাকার প্রতারণা

প্রতারণা, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও আইপিও জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ারবাজার থেকে ১ লাখ কোটি বা ১ ট্রিলিয়ন টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এর জন্য একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে প্রভাবশালী উদ্যোক্তা গোষ্ঠী, ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক এবং বিনিয়োগকারীরা ছিল।

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অপচয়

শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অপচয় হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে ৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও, এর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষ এবং বাড়তি খরচ দেখিয়ে এই বিপুল অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি ও জিডিপির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। তাদের মতে, বিগত সরকারের সময়ে পরিসংখ্যানের তথ্যের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল এবং প্রায় ৬ শতাংশ অর্থ করছাড় দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

অলিগার্কের উত্থান

শ্বেতপত্রের কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন যে, এই ৩০ অধ্যায়ের ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে কীভাবে পুঁজিবাদী অলিগার্করা উত্থান ঘটিয়েছে এবং তারা কীভাবে নীতি প্রণয়ন নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, বিগত সরকার উন্নয়নের নামে অনেক 'ভ্যানিটি প্রকল্প' বাস্তবায়ন করেছে, যা মূলত লুটপাট ও অপব্যবহারের জন্য ছিল।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

এ সময় শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে একটি ভেঙে পড়া অর্থনীতির সাথে কাজ করতে হচ্ছে, যা বিগত সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছে।

শেষ কথা

শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এটি কেবল এক সরকারের দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের অভাবের চিত্র নয়, বরং একটি নতুন ও সুষম অর্থনীতি গঠনের জন্য আগামীর জন্য দিকনির্দেশনাও প্রদান করেছে।

Post a Comment

0 Comments